পর্যটনও বড় অবদান রাখছে কাতারের অর্থনীতিতে

Home / Publications / Article / পর্যটনও বড় অবদান রাখছে কাতারের অর্থনীতিতে

তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল: পলিমাটির দেশ বাংলাদেশ। এখানে বিভিন্ন ধরনের শস্য ফলে, যা আমাদের সবার জানা। আবার রয়েছে প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া কিংবা ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান। ১৯৭১ সালে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ পাওয়া এবং এর আগে উপনিবেশসহ বিভিন্ন ঘটনার সাক্ষী আমাদের প্রিয় জš§ভূমি। দেখার জন্য রয়েছে অনেক দর্শনীয় স্থান, যেমন কক্সবাজার, যা বিশ্বের সর্ববৃহৎ সমুদ্রসৈকত। সুন্দরবন, যা বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট; রয়েছে মহাস্থানগড়, ময়নামতি, লালবাগের কেল্লার মতো ঐতিহাসিক স্থান। আরও রয়েছে মুগ্ধ করার মতো সাজেক ভ্যালি!

মরুভূমির দেশ কাতার, যেদিকেই চাইবেন শুধু ধূ-ধূ মরুভূমিই থাকার কথা। মরুভূমি বলতে বালু, বালিয়াড়ি, পানির উৎসের স্বল্পতা, যেখানে হয় না কোনো শস্য। যাদের খাবার থেকে শুরু করে অধিকাংশ প্রয়োজনীয় পণ্য অর্থের বিনিময়ে আমদানি করতে হয় বিভিন্ন দেশ থেকে। তবে ধনী হওয়ায় তারা সবচেয়ে দামি জিনিসগুলোই আমদানি করে থাকে। যেখানে কোনো শস্য নেই, যাদের সঙ্গী ৪৫-৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, সেই কাতার তাদের সব চাহিদা মেটায় ভূগর্ভস্থ তেল ও গ্যাস বিক্রি করে। কী পরিমাণ সম্পদ থাকলে একটা দেশ বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশের কাতারে উঠে আসে, ভাবতে পারেন?

কাতার বলতে আমার চোখে ভাসতো মরুভূমি, বালু, উট, খেজুর এসবই তো হওয়ার কথা, তাই না? কিন্তু ধারণা পাল্টে গেলো সেখানে পৌঁছে।

আমাদের রয়েছে প্রাকৃতিক কিংবা ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান, আর কাতারের ঐতিহাসিক কিছু স্থান রয়েছে কিন্তু প্রাকৃতিক স্থানের দিক দিয়ে তারা অনেক পিছিয়েÑএটাই স্বাভাবিক।

একটি নাতিশীতোষ্ণ দেশে থাকবে শান্তিময় মন হরণকারী প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। আর মরুভূমিতে থাকবে রুক্ষতা শূন্যতা, তাই নয় কি? নিজের যা কিছু আছে সেসবকে কীভাবে উপস্থাপন করতে হবে, কীভাবে তা আকর্ষণীয় করতে হবে, তা তাদের খুব ভালো করেই জানা। আমরা কি তা পারি? বিশ্বের সর্ববৃহৎ সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারকে আমরা কি পেরেছি সবার জন্য দর্শনীয় করে সাজাতে? নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে?

তাদের একটি আইল্যান্ড আছে, নাম বানানা! এটির আকার অনেকটা কলার মতো, তাই এ নামকরণ। সে আইল্যান্ডে একটি রিসোর্ট আছে, যা সে দেশে তেল-গ্যাসের খনি থাকা সত্ত্বে¡ও অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে। বলতে পারেন, এটি কীভাবে সম্ভব? একবার গিয়ে বেড়িয়ে আসতে পারেন। এখানে যেটি জুনিয়র সুইট, তা সাধারণ তিনজন প্রাপ্তবয়সের একটি ফ্যামিলি বা গ্রুপ থাকার মতো এর রেট শুরু হয়েছে ৫৩৬ ডলার (বাংলাদেশি টাকায় ৪২ হাজার ৮৮০), সি ভিউ সুইট শুরু হয় বাংলাদেশি টাকায় ৩৫ হাজার ১২০, ডিলাক্স সি ভিউ শুরু হয় ৩৯ হাজার ৫২০ টাকায়, আনান্তারা সি ভিউয়ের সর্বনিম্ন রেট ৪৭ হাজার ২৮০ টাকা, আর সবচেয়ে ব্যয়বহুল হলো দুই বেডরুমের ওভার ওয়াটার ভিলা, যা শুরু বাংলাদেশি টাকায় ২ লাখ ৫৪ হাজার ৮৮০। এগুলো সবই এক রাতের খরচ! এখানে রয়েছে বিভিন্ন বিলাসবহুল খাবার রেস্টুরেন্ট, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য রয়েছে বিনোদন ও খেলাধুলার অত্যাধুনিক ব্যবস্থা। তবে এসব কিছু আপনাকে অর্থের বিনিময়ে উপভোগ করতে হবে, একমাত্র সিনেমা হল রয়েছে সবার জন্য উম্মুক্ত ও বিনা মূল্যে। বাকি সব কিছুর জন্য গুনতে হবে পয়সা। এক গ্লাস জুস পান করতে যেখানে বাংলাদেশি টাকায় কমপক্ষে এক হাজার টাকা প্রয়োজন, সেখানে অন্যান্য জিনিস কেমন ব্যয়বহুল, তা নিশ্চয় বলতে হবে না? যারা প্রাকৃতিকভাবে আমাদের চেয়ে ততটা সমৃদ্ধ নয়, তারা কীভাবে এ রিসোর্ট করলো এবং জনপ্রিয় করে তুললো, তা ভাবছেন? এর মূলে ছিল সরকারের সহায়তা, একটি কার্যকর প্ল্যান, যা এ রিসোর্টকে স্বতন্ত্রভাবে চলতে সহযোগিতা করবে। আর শক্তিশালী বিপণণ ব্যবস্থা। ইউরোপ-আমেরিকার যারা কাতারে কখনও আসেননি, তারাও বানানা রিসোর্ট সম্পর্কে জানেন কীভাবে? কারণ তারা এক্ষেত্রে প্রযুক্তির সর্বাধিক ব্যবহার করে তাকে কাজে লাগিয়েছে, মোট কথা নিজেদের বিশ্ববাজারে প্রতিনিধিত্ব করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সম্প্রতি তারা পর্যটনকে প্রাধান্য দিয়ে ৮০টি দেশের জন্য উম্মুক্ত ভিসার ঘোষণা দিয়েছে। আমরা কি পারি না কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন, সুন্দরবনকে ঘিরে এমন কিছু করতে।

কাতার নিরাপত্তার দিক থেকে অনেক এগিয়ে, সেখানে থাকা দক্ষিণ এশীয়দের কাছে শুনেছি যে, যদি আপনি আপনার গাড়ি স্টার্ট অবস্থায় খোলা রেখে চলে যান, পরের দিন এসে দেখবেন ওই স্টার্ট অবস্থায়ই আছে, যদি না তেল ফুরিয়ে গিয়ে থাকে! সেখানে যে কোনো ইমারজেন্সি পরিস্থিতিতে ৯৯৯-এ ফোন করলেই দুই থেকে তিন মিনিটের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্সসহ পুলিশ এসে হাজির হয়। এমনকি নেপালি এক ব্যবসায়ীর কাছে শুনেছি, প্রয়োজনে রোগী পরিবহনে কিংবা যে কোনো জরুরি অবস্থায় তারা হেলিকপ্টারও ব্যবহার করে থাকে। রোগী পরিবহনের সময় তারা এটা দেখে না যে সে কে, কোথা থেকে এসেছে কিংবা কী করে, সে টাকা দিতে পারবে কিনা! আমরা কি এমনটা করতে পারি। আমাদের মা-বোন কি রাত ১২টার পর রাস্তায় নিরাপদ? না, আমি এখানে দেশের সমালোচনা করতে বসিনি কিংবা কারও সঙ্গে আমার প্রিয় জন্মভূমির তুলনা করতে বসিনি। আমাদের দেশ অতুলনীয় কিন্তু আমাদের কিছু জায়গায় পরিবর্তন, পরিমার্জন, গুরুত্ব দেওয়া দরকার কি না?

যে কয়দিন সেখানে ছিলাম বাইরে বের হতে হয়েছে নেহাত কোনো দুর্ঘটনা কিংবা কোনো সমস্যা ছাড়া, ট্রাফিক পুলিশ দেখিনি বললেই চলে। সব চলছে সিগন্যাল মেনে। কেউ কাউকে বেপরোয়াভাবে ওভারটেক করছে না। সবাই শৃঙ্খলা মেনে চলছে, নেই অযথা হর্নের শব্দ। একটা নির্দিষ্ট সময়ে সবুজ বাতি জ্বলছে, তারপর গাড়ি চলতে শুরু করে। আমার দেখা সবচেয়ে বেশি পাঁচ মিনিট জ্যাম পেয়েছি। কেউ নিয়ম ভেঙে ক্রসিং পার হচ্ছে না। জিজ্ঞাসা করতে পারেন কেন? কারণ সেখানে শক্ত আইন আছে, তার প্রয়োগও আছে, সবাই আইন মেনে চলছে। আপনি যদি সিগন্যাল হলুদ কিংবা লাল থাকা অবস্থায় রাস্তার হলুদ মার্ক ক্রস করেন, বাংলাদেশি টাকায় প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হবে। আপনি যে-ই হোন, ছাড় নেই। অথচ আমাদের আইন থাকা সত্ত্বেও প্রয়োগ হচ্ছে না, কেন বলতে পারেন? তার কারণ আমরা আইন বানাই নিজেরাই আইন ভাঙি, আমাদের ফোনের জোর বেশি। এক ফোন করেই অনেক কিছু হয়।

কাতারবাসী নারী কিংবা শিশুদের অনেক সমীহ ও সম্মান করে। তারা গৃহকর্মী, যাকে মেইড বলা হয় তাদের একসঙ্গে বসিয়ে একই রেস্টুরেন্টে খায়। আমাদের দেশে এ হার শতকরা কত, বলতে পারেন? আবার নারী উন্নয়নে তাদের রয়েছে স্বতন্ত্র গবেষণা কেন্দ্র।

এতক্ষণ বললাম একটি মরুভূমির দেশের কথা। কিন্তু আমাদের দেশ তো পলিমাটির, রয়েছে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। আমাদের রয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সোনা ফলা মাটি। কিন্তু আমরা কেন পারছি না আমাদের যা আছে তা গুছিয়ে উপস্থাপন করতে। কেন পারছি না আইনকে কার্যকর করতে, কেন পারছি না যত্রতত্র নারীরা যে অপমান-লাঞ্ছনার মুখোমুখি হচ্ছে, তা রোধ করতে। আমরা কি আসলেই পারি না, সেই জোস কি আর নেই? স্বাধীনতার চেতনা, দেশপ্রেম সব কি এখন পাঠ্যপুস্তক আর লেখায় সীমাবদ্ধ?

মানবসম্পদ প্রশিক্ষক

chanchal.song@gmail.com

পর্যটনও বড় অবদান রাখছে কাতারের অর্থনীতিতে

Please follow and like me
500

Leave a Reply

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial