রোমেছাদের বাড়ি ফেরা যেন বিষাদে পরিণত না হয়

তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল:

রোমেছা একজন গার্মেন্ট মেশিন অপারেটর। বাড়ি লালমনিরহাটের মোগলহাট ইউনিয়নে। ঢাকায় আছে সাত-আট বছর ধরে। তার সঙ্গে থাকে স্বামী আর এক ছেলেসন্তান। বাড়িতে রয়েছেন বাবা-মা আর এক ছোট ভাই। রোমেছা যখন গ্রামে ছিল, তখন তার বিয়ে হয়নি। সে আর মা মানুষের বাড়ি ও ক্ষেতখামারে কাজ করতো। বাবা কবছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় দুই পা হারানোয় কাজ করার সামর্থ্য নেই। গরিব হলেও মান-সম্মানের ভয়ে ভিক্ষেও করতে পারেন না; আবার সংসারও চলে না। সেজন্যই রোমেছা আর তার মা দিনহাজিরায় কাজ শুরু করেছিলেন। ছোট ভাইটি বাউণ্ডুুলেদের সঙ্গে মিশে একেবারে বখে গেছে। ওকে দিয়ে আর কিছুই হবে না তা রোমেছা খুব ভালো করে জানে। সে তো বাসায় এসে ভাত সামনে পায়; কী করে বুঝবে গ্রাম এলাকায় মেয়েমানুষরা কাজ করে কত টাকাইবা আয় করতে পারে! পুরুষ দিনমজুরদের দিনহাজিরা সব সময় একটু বেশি থাকে। হুট করে রোমেছার মাকে শ্বাসকষ্টটা বেশি যন্ত্রণা দিচ্ছিল; তাই তিনি কাজে অনিয়মিত হয়ে পড়েছিলেন। এভাবেই পুরো পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব একা রোমেছার ওপর বর্তায়। আজও বাড়িতে সবার পরিস্থিতি সেরকমই আছে; কিন্তু ঢাকায় রোমেছার জীবনে যোগ হয়েছে আরও দুটি মানুষÑতার স্বামী আর সন্তান। যখন এলাকায় আয় করে সংসার চালানো তার জন্য দুষ্কর হয়ে গিয়েছিল, ঠিক সে সময় পাশের গ্রামের আলী ভাই তাকে ঢাকায় চাকরির প্রস্তাব দেন গার্মেন্টে ‘হেলপার’ হিসেবে। বেতন তিন হাজার টাকা। ওভারটাইমসহ ছয় থেকে সাত হাজার টাকা হবে। আবার প্রতি বছর বেতন বাড়বে। কোনো দিক চিন্তা না করে আলী ভাইয়ের কথামত ঢাকায় এসে গার্মেন্টে যোগ দিল। অনেক স্বপ্ন মনেÑকিছু একটা করতে হবে। ভাইটি, বাবা-মা যেন ভালো থাকেন, সে ব্যবস্থা! শুরু হলো কাজ। তবে ঢাকায় গার্মেন্টে কাজ করবে জেনে এলাকার অনেক মহিলা তাকে একটু তিরস্কারও করেছিল। যেন গার্মেন্ট শ্রমিকের মান-সম্মান নেই, তারা মানুষের কাতারে পড়ে না! কিন্তু সব কথা উপেক্ষা করে ঢাকায় এসেছিল সে, তাই তার একমাত্র লক্ষ্য ভালো কাজ করে উন্নতি করা। রোমেছা কাজে অনেক মনোযোগী, তাই সুপারভাইজার রফিক চাকরির শুরু থেকেই তাকে খুব পছন্দ করতেন। লাইনে যখন কাজ থাকতো না, তখন রফিক তাকে অপারেটরের কাজ শেখাতেন। তাই কাজে যোগ দেওয়ার ছয় মাসের মাথায় রোমেছা প্লেন মেশিনে দুটি প্রসেস আর টু নিডল মেশিনের প্রসেস শিখে নেয়। তাই তার মজুরিও প্রায় ১৫০০ টাকা বেশি হয়ে যায়। রফিকের সহায়তায় রোমেছা এক পর্যায়ে আরও ভালো বেতনে চাকরিতে স্থিত হয়। কিন্তু একটি পরিবর্তন তার জীবনে ইতোমধ্যেই ঘটে যায়। তার জীবনে যোগ হয় স্বামী হিসেবে পাশের কারখানার সুপারভাইজার আনোয়ার। তার বাড়িও কুড়িগ্রামে। কোনোরকম খেয়ে-না খেয়ে সব খরচ চালিয়ে রোমেছা দেড় বছরের মধ্যে তার ভাইকে এলাকায় একটা ছোট পানদোকান ধরিয়ে দেয়। বাড়ি খুব একটা যাওয়া হয় না। বছরে দুই ঈদে যা একটু ছুটি পাওয়া। ঈদের আগে তাদের একটাই চিন্তাÑকীভাবে বাড়ি যাবে, কার জন্য কি নেবে। সাধ্যও তেমন নেই। রোমেছার বেতন এখন ছয় হাজার ৪২০ টাকা। ওভারটাইমসহ মাসে আট-নয় হাজার টাকা; কিন্তু তাতে কি, জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে তো বাড়ছেই; আবার বাড়ির মালিক কখনও কখনও ছয় মাস না যেতেই বাড়িভাড়া বাড়ান। কেন যে তারা এমন করেন কেউ দেখার নেই!

পাশের কারখানার লাইন চিফ লিটন স্যারের বাড়ি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী। তিনি প্রতি বছর রিজার্ভ বাস নিয়ে আশেপাশের এলাকার যারা গার্মেন্টে কাজ করে, তাদের এক সঙ্গে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে যান। ভালোই লাগে তাতে। যেতে একলা লাগে না, আবার পরিচিতরা এক সঙ্গে গেলে মানসিক একটা শান্তিও থাকে। কিন্তু বাসগুলো দেখতে যেন একদম মুড়ির টিন। ঢাকার লোকাল বাসগুলোর মতো। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ওই আঁটোসাঁটো সিটে বসে এতদূর যাওয়া কী কম ধকল! তবুও ওটাই ভরসা; কারণ ঈদে বাসভাড়া যে হারে বাড়ে, তাতে যেতে-আসতে বোনাসের একটা বড় অংশ চলে যায়। আবার যাত্রার দিন রিকশা/সিএনজি ট্যাক্সি ভাড়া করে বাস কাউন্টারে যাওয়াও তো খরচের পালা। লিটন স্যার একটা বাস ভাড়া করেছেন, সুবিধা হলো বাসটি একেবারে কারখানার পাশে এসে থামবে। রোমেছার স্বামী পাশের কারখানায় কাজ করেন, ছেলে চাইল্ড কেয়ারে, ব্যাগট্যাগ নিয়ে তাই আজ সে কারখানায় এসেছে। অবশ্য কারখানায় ব্যাগ নিয়ে ঢুকতে দেবে না; তাই পাশের পরিচিত দোকানে ব্যাগটা রেখেছে সে। ব্যাগে তার বাবা-মা আর ভাইয়ের জন্য রয়েছে নতুন কাপড়। রোমেছার মতো অন্যান্য অপারেটর-হেলপার কিংবা লাইন চিফ-সুপারভাইজারদের যেদিন কারখানা ছুটি হয়, সে দিনটাই তাদের কাছে আসল ঈদ। সবাই নিজেদের নতুন জামাটা পরে আসে, উৎসাহী ভাইয়েরা মিউজিক সিস্টেম ভাড়া করে এনে সকাল থেকেই তা বাজানো শুরু করে। যে যার নতুন জামাটি পরে নিজের পছন্দমতো সেজেগুজে কারখানায় আসে। কী মজা জানেন! এই যে এক সঙ্গে যারা কাজ করছেন, এ যে কর্মক্ষেত্রÑএটাকে তারা পরিবারের মতোই মনে করে। আবার এতদিন পর বাড়ি যাওয়ার আনন্দ, আর বাড়িতে কাকে নতুন জামাটি দেখাবে? কে আছে? যারা আছে, তারা অনেকে তো এখনও গার্মেন্ট শ্রমিকদের তীর্যক চোখে দেখে! অথচ দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো এই গার্মেন্টশিল্প। তাতে কি রোমেছা বা অন্য যারা এখানে কাজ করেন, তাদের এসব কথায় কিছু যায় আসে না! তারা যে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরিশ্রম করে রফতানি আয় বাড়ানোয় শরিক হচ্ছে এসবের মূল্যায়ন কজন করেন। রোমেছাদের বেতন-বোনাসের আট হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে দুই হাজার ৪০০ টাকা খরচ হবে বাস ভাড়া, পথে অন্যান্য খরচ ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। বাবা-মা, ভাইয়ের পোশাকে দুই হাজার ৫০০ টাকা, বাবুর জন্য শার্ট-প্যান্ট আর ঘড়ি এক হাজার ৩০০ টাকা, রোমেছার জামা এক হাজার ২০০ টাকা; সর্বমোট খরচ সাত হাজার ৮০০ টাকা! তাহলে হাতে থাকলো কত? মাত্র ৮০০ টাকা! এ দিয়ে বাড়ি গিয়ে ঈদের বাজার-সদাই কী হবে?

রোমেছা বাড়ি যাবে। কত আনন্দ মনে; কিন্তু মনে সংশয়Ñবাবুটার কদিন আগে চিকুনগুনিয়া হয়েছে; শরীরটা এখনও অতটা সুস্থ নয়। এবারও যদি গতবারের মতো বাড়ি যেতে ২৫ ঘণ্টা বা তার বেশি লাগে, তাহলে কী হবে? গতবার বাইপাইল থেকে চন্দ্রা পার হতেই পাঁচ ঘণ্টা লেগেছিল। তবুও রোমেছারা বাড়ি যায় পরিবারের টানে, নাড়ির টানে। সরকার আসে, সরকার যায়। টিভিতেও দেখা যায় সব ঠিকঠাক। তখন মনে একটা বলও আসে; অথচ যাত্রা শুরুর পর যখন দেখা যায় যেইকে সেই, তখন মনটা দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়।

প্রতি বছর ঈদের সময় সড়ক দুর্ঘটনায় অনেকেই প্রাণ হারান। এর কারণ বিভিন্ন। তার মধ্যে ঢাকা থেকে ভাড়া করা লোকাল গাড়ির চালকদের অদক্ষতা অন্যতম। নিষেধ থাকা সত্ত্বেও মহাসড়কে চলে সিএনজি অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, থ্রি হুইলার, পণ্যবাহী গাড়ি। কোনো শ্রমিক কিছু টাকা বাঁচাতে, আবার কেউ টিকিট না পেয়ে ট্রাক-পিকআপসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী গাড়িতে করে বাড়ি অভিমুখে যাত্রা করে আর এতেই ঘটে যত বিপত্তি! কেউ কেউ বাড়িতে ফেরেন নিথর দেহ নিয়ে। পরিবারের উপার্জনক্ষম একজনের মৃত্যুতে সে পরিবার হয়ে পড়ে চরম অর্থনৈতিক টানাপড়েনে। পেছন দিকে ঘুরে যায় ভাগ্যের চাকা।

পোশাক কিংবা অন্যান্য শিল্পশ্রমিকের নিরাপত্তা, অধিকার, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে দেওয়া হয়ে থাকে প্রশিক্ষণ। আমরা কি পারি না তাদের ঈদের সময় যাতায়াতের ক্ষেত্রে তারা কীভাবে নিরাপদে থাকবে, নিরাপদে বাড়ি পৌঁছাবেÑসে সম্পর্কে নির্দেশনা দিতে। গ্রাম থেকে আসা সরল-সহজ একজন মানুষকে আমরা যখন নিয়োগ দিই, তখন কি আমরা তার কাছে যে দক্ষতা প্রয়োজন, তা পাই? নিশ্চয়ই নয়। আমরা তাদেরকে আমাদের মতো করে তৈরি করে নিই, ঠিক তেমনি তাদের বিষয়ে গুরুত্ব ও ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ালে অনেকেই হয়তো এ ধরনের ঝুঁকি আর নেবে না। এক্ষেত্রে ঈদের সময় মহাসড়কে চলাচল উপযোগী যানবাহনের বিষয়টিও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রোমেছার মতো অন্যান্য শ্রমিকের ঈদ আনন্দময় ভ্রমণ যেন শোকে পরিণত না হয়, সেক্ষেত্রে আমাদের যার যার অবস্থান থেকে সচেতনতা বাড়ানো উচিত।

মানবসম্পদ প্রশিক্ষক

রোমেছাদের বাড়ি ফেরা যেন বিষাদে পরিণত না হয়

Please follow and like me
500

chanchalbd Author

Leave a Reply