শিশু-কিশোরের ক্ষেত্রে সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিন

Home / Publications / Article / শিশু-কিশোরের ক্ষেত্রে সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিন

তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল : শিশুরা সাবালক না হওয়া পর্যন্ত জীবনের নানা বিষয়ে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অভিভাবকের মুখাপেক্ষী থাকে বা থাকা উচিত। অভিভাবকদের সঠিক নির্দেশনা যেমন তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করে, ঠিক তেমনি আমাদের ভুল নির্দেশনা তার চিন্তা-চেতনায় বড় ধরনের কুপ্রভাব ফেলতে পারে। আমার কাছে যেটা উদ্বেগের বিষয়, তা হলোÑএই শিশুরা কেন, কীভাবে বিভিন্ন সামাজিক অপরাধে জড়াচ্ছে? তা নিয়েই আজকের লেখা।

একদিন রামপুরা থেকে মৌচাকের রাস্তায় হাঁটছি। দেখলাম আনুমানিক ছয় থেকে ১২ বছর বয়সের কয়েকটি ছেলেমেয়ে একত্রিত হয়েছে (যাদের আমরা টোকাই বলে থাকি), তাদের মধ্যে তিন-চারজনের হাতে একটি করে প্লাস্টিকের ব্যাগ। সে ব্যাগে মুখ লাগিয়ে তারা জোরে জোরে শ্বাস টানছে। কৌতূহলবশত পাশের দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি বললেন, ‘আর বলবেন না ভাই, ওরা জুতা জোড়া লাগানোর গাম প্লাস্টিকের ব্যাগে ঢুকিয়ে টানছে, এতে নাকি নেশা হয়!’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনারা কিছু বলেন না? এভাবে খোলা রাস্তায় নেশা করছে যে!’ তিনি বললেন, ‘ভাই এরা পারে না এমন কাজ নেই, এ জমানায় কে অন্যের ভালো করতে গিয়ে নিজের ক্ষতি টেনে আনবে বলুন? আর যারা নিজেই নিজের ভালোমন্দ বোঝে না, তাদের কী বোঝাবেন।’ আমি বললাম, ‘ভাই এরা তো শিশু।’ তিনি বললেন, ‘আর সে কথা বলবেন না, যাদের মিছিল-মিটিংয়ে ব্যবহার করা হয়, যারা এভাবে নেশা করে বিভিন্ন সামাজিক অপরাধে জড়ায়, তাদের শিশু বলেন কীভাবে?’ ভদ্রলোক উল্টো এমন এক প্রশ্ন করলেন, যা আমাকে সত্যিই ভাবিয়ে তুললো। শিশুর সংজ্ঞা নিয়ে ভাবিয়ে তুললো। এদের বেশিরভাগই ভেঙে যাওয়া সংসারের অংশ, যাদের কারও হয় বাবা আছে, মা ছেড়ে চলে গেছে অথবা মা আছে তো বাবা ছেড়ে চলে গেছে; এরা বেড়ে উঠছে রাস্তায়। যাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হয় না, নিশ্চয়ই তাদের সমাজ বা রাষ্ট্রের প্রতি একটি ক্ষোভ জš§ায় আর এক সময় এরাই হয়ে ওঠে নিষ্ঠুর-পাষাণ। গতবার এলাকায় গিয়ে শুনলাম মিছিলের জন্য বস্তির শিশু-কিশোরদের বয়স ও গঠন হিসেবে ৪০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত রেট আছে। যার যেমন বাজেট, সে হিসেবে লোক নেয়। কেউ কি আর নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে যাবে!

হাতিরঝিলে প্রায়ই দেখা যায় একদল ছেলে মোটরসাইকেল প্রতিযোগিতা করছে। সাপ যেমন এঁকেবেঁকে চলে, ঠিক সেভাবে বেপরোয়া তাদের চালনা। এমন কি অনেক মোটরসাইকেলে তিনজন থাকে; কারোই কিন্তু হেলমেট থাকে না। একদিন সাহস করে একজনকে জিজ্ঞাসা করলামÑভাই, হেলমেট পরো না কেন? ছেলেটি বললোÑ‘হেলমেট পরলে মাথা গরম হয়, তাই পরি না।’ এদের কাউকেই দেখে মনে হয় না তারা সচ্ছল পরিবারের সন্তান আর তাদের মোটরসাইকেলটি অভিভাবক কিনে দিয়েছেন। দুই-তিন লাখ টাকা দামের একটি বাইক কি ধরনের বেশধারীর থাকার কথা, তা তো বোঝা যায়। তাহলে এরা মোটরসাইকেল পেলো কোথা থেকে? যদি কিনেও থাকে, তবে এদের আয়ের উৎস কী?

সমাজের এক শ্রেণির শিশুর কথা বলি, যারা সচ্ছল পরিবারের। তাদের মনে ঢুকছে বিষ প্রতিটি ক্ষণে, প্রতিটি মুহূর্তে। আজ পরিবার, সমাজ কোনোটাই বাকি নেইÑসবই বিষাক্ত হয়ে গেছে! আট থেকে ১৬ বছরের শিশুকে যখন তার অভিভাবক বলছেনÑঅমুকের সঙ্গে মেলামেশা করো না, অমুকের সঙ্গে খেলাধুলা করো না, অমুক জায়গায় যাওয়া যাবে না, অমুক অনুষ্ঠান শোনা যাবে না, এ করা যাবে না, ও করা যাবে না! এ অবস্থায় শিশুর মনে নানা প্রশ্ন জাগে; কিন্তু পারে না আদেশদাতাকে জিজ্ঞাসা করতে, পারে না অন্য কাউকে জিজ্ঞাসা করতে; কিন্তু মনে মনে ঠিকই উত্তর খুঁজতে থাকেÑকেন করা যাবে না? কেন মেশা যাবে না? কেন যাওয়া যাবে না? কেন দেখা যাবে না? অতঃপর প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে না পেয়ে আপন মনেই উত্তর খুঁজতে থাকে; কিন্তু সঠিক উত্তর পাওয়া সম্ভব হয় না তাদের।

আমরা ধর্মের কথা বলি। সমাজের বিভিন্ন স্তরে এ ধর্ম নিয়েই শিশুদের মনে যে বিষ ঢুকে যায়, তা আমৃত্যু রয়ে যায়। এর জন্য দায়ী কে বা কারা? পৃথিবীতে এমন কোনো ধর্ম আছে কি, যা অন্য ধর্মকে অসম্মান করার কথা বলে? অন্য কোনো গোষ্ঠীর লোককে ঘৃণা করতে বলে? ধর্মের নামে নাশকতা করতে বলে? অবশ্যই উত্তর আসবেÑনা, নেই। তবে আমরা সবাই কেন ছোটবেলা থেকে শিশুদের মধ্যে এ ভেদাভেদ, এ ঘৃণা ঢুকিয়ে দিই বলতে পারেন? আমি আমার শিশুকে হিন্দি কার্টুন দেখতে নিষেধ করতে পারি; কিন্তু কেন নিষেধ করছিÑআছে কি তার কোনো ব্যাখ্যা? বলতে পারেন, সেসব দুষ্টুমিতে ভরা আর শিশুরা হিন্দি ভাষা শিখছে, তাদের পড়াশোনায় ক্ষতি হচ্ছে, তাদের মাথায় সারাক্ষণ কার্টুন ঘুরপাক খাচ্ছে। তাহলে এ কার্টুন বাংলাদেশে চালু হলো কেন? কে চালু করলো? যখন চালু হলো, তখন কেউ এগিয়ে এলেন না কেন? আমরা আমাদের সংস্কৃতির আবহে শিশুদের জন্য কী করছি? অভিনব কী তৈরি করছি, যা থেকে তারা শিখবে, আবার বিনোদনও পাবে? জানামতে আজ পর্যন্ত যতজন কিছু করার উদ্যোগ নিয়েছেন, কখনও অর্থের অভাবে, কখনও অনুষ্ঠান চলছে না এ অজুহাতে তাদের সে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। বাংলাদেশে কী একজন ট্যালেন্টও নেই যে ডরেমন, সিঞ্চন-এর মতো কার্টুন নির্মাণ করতে পারেন? নেই কি এমন কেউ যে, কার্টুনের মাধ্যমে শিক্ষণীয় অনেক কিছু শিশুদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারেন? যে মানুষটি পড়তে জানে না, তাকে বোঝানোর ভাষা যেমন একটি ছবি হতে পারে; ঠিক অবুঝ শিশুকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে এমন সৃষ্টিশীল কিছু করতে আমরা কী পারি না? নাকি পেরেও করছি না! অবশ্য মেধাবীরা অনেকেই দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমান। হয়তো তাদের ধরে রাখার ক্ষমতা আমাদের এখনও হয়নি। যারা দেশে আছেন, তারাই বা কম কিসে!

ঢাকা শহরে আমার মতো যারা সন্তানের বাবা, তারা কতটাই না আফসোস করি মাঝে মাঝে। আমরা এসেছি মফস্বল থেকে; সেখানে রয়েছে খেলার জন্য বিস্তৃত মাঠ, ঘুম থেকে উঠে সবুজ ঘাসে খালি পায়ে হাঁটা, প্রতিবেশী শিশুদের সঙ্গে গোল্লাছুট, বৌচি, দাড়িয়াবান্ধা, ডাংগুলি, ক্রিকেট, ফুটবল আরও কত খেলার ব্যবস্থা। আর সন্ধ্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে এক দৌড়ে বাড়ি। অতঃপর উচ্চৈঃস্বরে পড়াশোনা, যেন অভিভাবকদের জানান দিচ্ছিÑএই তো আমি পড়ছি! আর আমাদের শিশুরা ঢাকার মতো যান্ত্রিক নগরে বহুতল ভবনের ফ্ল্যাট থেকে বিষণœ বদনে চেয়ে থাকে রাস্তায় কে আসে, কে যায়! সকালটা শুরু হয় পাঁচ থেকে ১০ কেজি ওজনের একটি বইয়ের ব্যাগ নিয়ে। স্কুল শুরু হয় ইয়েস মিস, স্ট্যান্ডআপ, সিটডাউন আর একগাদা হোম ওয়ার্কের মধ্য দিয়ে! বাসায় এসে শুধু একটু নাস্তা করে হাত-মুখ ধুয়ে শুরু হলো পড়ার যুদ্ধ মা’তে, হোম টিচারে, খাতায়, বইসহ নানাভাবে। অতঃপর তিন-চার ঘণ্টা অক্লান্ত পরিশ্রমে বাছা আমার ক্লান্ত শরীরে শেষ করে পরদিনের পাঠ। কীসের খেলা, কীসের কী? আশেপাশে আছে কী কোনো বিনোদনের ব্যবস্থা? চারদিকে তো শুধু অট্টালিকাগুলো অট্টহাসি দিচ্ছে! বিনোদন বলতে যে শিশুর একমাত্র সম্বল ‘কার্টুন’! কার্টুন থেকে সে মিথ্যা বলা শিখছে, ভিনদেশি ভাষা শিখছে, শিখছে ছলচাতুরী! অভিভাবকরা তাদের সময় দিতে পারি না; তাই হয়তো অনেক সময় সে অভাব পূরণের জন্য তাদের হাতে তুলে দিই দামি ট্যাব, মোবাইল ফোন, এক সময় মোটরসাইকেল। আর সর্বনাশের শুরু সেখান থেকেই। একটি যন্ত্র কি কখনও অভিভাবকের স্থান দখল করতে পারে? একটি শিশুর ক্ষেত্রে তার পরিবার থেকেই সামাজিকতার প্রথম পাঠ শুরু হয় আর এই আমরাই যখন তাদের সময় না দিয়ে একটি গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলি, তাদের সঠিক ব্যাখ্যা না দিয়ে শুধু ‘না’ শব্দটি বলি; বুকে হাত দিয়ে বলতে পারিÑএটি কখনই মঙ্গলজনক নয়। অনেকের মাঝে থেকেও তাদের একাকীত্ব থেকেই যায়, তাই যৌথ পরিবারে থেকে আমরা মানবিক যে গুণাবলিগুলো পেয়েছি, যেমনÑদয়ামায়া, ভালোবাসা প্রভৃতি তাদের মধ্যে থাকে না, এটাই স্বাভাবিক। হয়তো বলতে পারেন, ঢাকা শহরে যৌথ পরিবার অসম্ভব একটা ব্যাপার। এক্ষেত্রে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই; কিন্তু আপনার শিশুকে আপনার মতো করে গড়ে তুলতে হলে তাকে তো সময় দিতে হবে। সময় না দিলে তারা শিখবে কোথা থেকে? এসব তো পাঠ্যপুস্তক পড়ে রপ্ত করার বিষয় নয়। আর যে পথশিশুদের কথা বললাম, তাদের ক্ষেত্রে আমাদের কিছু দায়িত্ব রয়েছে। কিছু এনজিও এ বিষয়ে কাজ করছে, তাদের সাধুবাদ জানাই। কিন্তু শুধু কয়েকটি এনজিও কি পারবে সব শিশুকে সুপথে পরিচালিত করতে? মনে রাখতে হবে, মাদক নিরাময় কেন্দ্র কিংবা কিশোর সংশোধন কেন্দ্র করার চেয়ে যে কারণে একটি শিশু বা কিশোর মাদক সেবন করছে, সামাজিক অপরাধ করছে সে কারণগুলো খুঁজে বের করে তার নিরাময় করতে হবে।

মানবসম্পদ প্রশিক্ষক

শিশু-কিশোরের ক্ষেত্রে সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিন

Please follow and like me
500

Leave a Reply

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial